


অদ্য ডিসেম্বর ০৯, ২০২৪ খ্রিঃ, তারিখ সোমবার বেলা এগারটায় বেগম রোকেয়া দিবস উপলক্ষে জেলা প্রশাসন ও মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর, ফরিদপুরের আয়োজনে ৫ জন জয়িতাকে এ বছর ফরিদপুর জেলায় নিজ নিজ জায়গায় অসামান্য অবদানের জন্য শ্রেষ্ট নারী নির্বাচিত হওয়ায় উক্ত অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে মাননীয় জেলা প্রশাসক ও বিজ্ঞ জেলা ম্যাজিস্ট্রেট জনাব মোহাম্মদ কামরুল হাসান মোল্যা মহোদয় কর্তৃক সম্মানসূচক ক্রেষ্ট, সনদপত্র এবং সংবর্ধনা প্রদান করা হয়। বিশেষ অতিথি হিসেবে আসন অলংকৃত করেন জনাব মোঃ আব্দুল জলিল, পিপিএম, পুলিশ সুপার মহোদয়, ফরিদপুর, সভাপতিত্ব করেনঃ জনাব মোঃ ইয়াছিন কবির, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মহোদয় ফরিদপুর সহ বিভিন্ন দফতরের শীর্ষ ব্যক্তিত্ব ও সুধী সমাজের প্রতিনিধি সহ প্রিয় সাংবাদিক ভাইয়েরা উপস্থিত ছিলেন।
অন্যদিকে একই দিন ও সময়ে ভাঙ্গা উপজেলায় জয়িতা পুরস্কার গ্রহন করেন হাজী সামর্তবানের পক্ষে নিজ সেঝো ছেলে ওবায়দুর রহমান, বিএসসি সম্মান ও এমএসসি (গনিত)।
সমাজ উন্নয়নে অসামান্য অবদানকারী নারী ক্যাটাগরিতে জয়িতা হিসেবে ভাঙ্গা উপজেলায় ও সমগ্র ফরিদপুর জেলায় এ বছর শ্রেষ্ট নারীর মর্যাদাপ্রাপ্ত জয়িতা নারীর জীবনের বন্ধুর পথ পাড়ি দেওয়ার হার না মানা গল্পঃ
জয়িতা নির্বাচিত নারী হাজী সামর্তবান, অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা হাজী আব্দুল করিম ও সামর্তবান ফাউন্ডেশন, পিতার নাম: মৃত হেলাল উদ্দিন মিয়া, মাতা: মৃত সবজান খাতুন, প্রায় ১৯৪৩ সনের দিকে গোপালগঞ্জ জেলার, মুকসুদপুর উপজেলার মুন্সিনারায়ণপুর নামক প্রত্যন্ত গ্রামে এক রক্ষণশীল মুসলিম পরিবারে জন্ম গ্রহন করেন। ১২ ভাইবোনের মধ্যে সবার বড় ছিলো।পরিবারের আর্থিক অস্বচ্ছলতা ও বিভিন্ন ধরনের কুসংস্কার এবং গোড়ামির জন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গিয়ে পড়াশোনার সুযোগটুকু হয়নি, অন্যদিকে তখনকার সময়ের এক সাধারন রেওয়াজ অনুযায়ী অল্প বয়সে ফরিদপুর জেলার ভাঙ্গা উপজেলার হিরালদী গ্রামের এক রক্ষণশীল মুসলিম পরিবারে হাজী আব্দুল গগন মিয়ার ছেলে আব্দুল করিম মিয়ার সাথে ধর্মীয় রেওয়াজ অনুযায়ী পারিবারিক ভাবে বিয়ে সম্পন্ন হয়। স্বামীর সংসার ছিলো মুলত কৃষি কেন্দ্রিক ও বৃহৎ যৌথপরিবার, বেশ কৃষি জমির মালিক হওয়ায় তা সামলানো অনেক কঠিন কাজ ছিলো। এক পর্যায়ে নিজেকে কোনো রকমের মানায় নেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করে এবং উক্ত সময়ে এক এক করে ৯ সন্তানের সফল জননী হয়। পরবর্তীতে নিজের ৯ ছেলে মেয়েকে যেভাবেই হোক ভালো মানুষ হিসেব গড়ের তোলার জন্য উচ্চ শিক্ষিত ও প্রতিষ্ঠিত করার জন্য এক ধরনের ইস্পাত কঠিন দৃঢ় প্রতিজ্ঞা পেয়ে বসেছিলো, এমনি এক সময় নিজের এক ছেলে সন্তান অল্প বয়সে ইন্তেকাল করায়, প্রচন্ডভাবে মানুষিকভাবে ভেঙ্গে পড়ার উপক্রম হয়, পরবতীতে নিজেকে কোনোরকম সামলিয়ে অবশিষ্ট আট সন্তানকে নিয়ে জীবনের লক্ষে পৌঁছানোর স্বপ্ন পূরণের পথে হাটতে থাকেন, কারন তার নিজের জীবনের ঘাটতিটুকু বা অপুর্ণতাটুকু সন্তানের মাধ্যমে পূরণ করা, আর অন্য দিকে তখনকার সময়ে অত্র অঞ্চলে বিশেষ করে হিরালদী গ্রামে শিক্ষার আলো মুলত: ছিলো না, এমনকি শিক্ষার মতো ভালো উদ্যোগ কে নিরুৎসাহিত করার অপচেষ্টা সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের মধ্যে ব্যাপক আকারে ছিলো, কিছু ক্ষেত্রে নেতিবাচক ভাবে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হতো বিশেষ করে এক পর্যায়ে নিজের মেয়েদের মাধ্যমিক স্কুল পর্যন্ত পড়ালেখা সীমাবদ্ধ রাখতে বাধ্য হতে হয়েছে, তবে ধর্মীয়ভাবে মৌলিক শিক্ষা দিতে সমর্থ হয়েছে, স্বামীর একান্ত আগ্রহ ও প্রত্যক্ষ সহযোগীতায় এই বন্ধুর পথ টুকু পাড়ি দেওয়ার চেষ্টা করেছে । জীবনের পট পরিক্রমায় কৃষি অর্থনীতি পরিবারের মূল চালিকা শক্তি হওয়ায়, অন্যদিকে পরিবারের নগদ অর্থের যোগান অস্বাভাবিকভাবে কমে যায়, বিভিন্ন ধরনের প্রাকৃতিক ও মনুষ্য সৃষ্ট প্রতিবন্ধকতার কারনে। নিজের বাবার একান্ত সহযোগিতায় ও আগ্রহে নিজের দিকে না তাকিয়ে শুধুমাত্র ছেলেমেয়েদের দিকে তাকিয়ে দৃঢ়ভাবে এগিয়ে যায়। আর্থিক অস্বচ্ছলতার সাথে বিভিন্ন ধরনের গোরামী ও কুসংস্কারের সাথে প্রতিনিয়ত লড়াই করে ইস্পাত কঠিন লক্ষে অটুট থাকে এবং মহান আল্লাহর রহমতে অন্যায়ের সাথে আপোষ না করে প্রত্যাশা পূরনে কিছুটা হলে ও সক্ষম হয়। আজ তার আট ছেলে মেয়ে ও তাদের ছেলেমেয়েরা বেশ প্রতিষ্ঠিত।
১। বড় ছেলে নজরুল ইসলাম, স্নাতক, নিজে, বউমা, ২ নাতি- নাতনি সহ মোট চার জন আজ আমেরিকায় প্রতিষ্ঠিত,
২। মেঝো ছেলে মো: শহীদুল ইসলাম, হিরালদী গ্রামে এসএসসিতে মানবিকে প্রথম স্টার মার্কপ্রাপ্ত, স্নাতকোত্তর, সরকারী চাকরীজীবি, বউমা স্নাতক।
৩। সেঝো ছেলে ওবায়দুর রহমান, অত্র গ্রামের মধ্যে প্রথম বিএসসি সম্মান ও এমএসসি (গনিত), সরকারী চাকুরীজীবী, বউমা স্নাতক।
৪। ছোটো ছেলে মো: রফিকুল ইসলাম অত্র গ্রামের মধ্যে প্রথম বিকম সম্মান ও এমবিএস (এ্যাকাউন্টিং), ব্যাংকার, বউমা বিকম সম্মানও এমকম (ব্যবস্থাপনা), ব্যাংকার।
এবং মেয়েদের ছেলেমেয়েরা ও আজ উচ্চ শিক্ষিত ও প্রতিষ্ঠিত।
নিজের পরিবারের সদস্যদের ভালো মানুষ হওয়ার জন্য সুশিক্ষায় শিক্ষিত করে প্রতিষ্ঠিত করে বিগত কয়েক বছর ধরে আনুষ্ঠানিক ভাবে সমাজ উন্নয়নে মনোনিবেশ করেছে। সমাজে দরিদ্র ও মেধাবীদের মেধাসম্পদে বিকশিত করার জন্য ইতিবাচকভাবে উৎসাহিত করার জন্য ঘোষনা করে শিক্ষাবৃত্তি ২০২৪ এবং ইতোমধ্যে শিক্ষাবৃত্তি প্রদানের মাধ্যমে তা আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করেছে। অন্য দিকে প্রান্তিক জনগোষ্ঠিকে বিশেষ করে গ্রামের খুব সাধারন মহিলাদের গ্রামভিত্তিক কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী করে টেঁকসই ভাবে এগিয়ে নেওয়ার জন্য পারিবারিক ভাবে প্রতিষ্ঠা করা হয় হাজী আব্দুল করিম ও সামর্তবান ফাউন্ডেশন নামক এক অলাভজনক দাতব্য প্রতিষ্ঠান। যার রেজি নং ফরিদ-৯৮৪, কার্যএলাকা সমগ্র ফরিদপুর জেলা, প্রতিষ্ঠাকাল ০৫ নভেম্বর ২০২২ খ্রি:। মুলত: প্রতিষ্ঠাতাদ্বয় মরহুম হাজী আব্দুল করিম মিয়া ও হাজী সামর্তবান, তবে তাদের জীবনের সামাজিক ও মানবিক কাজ গুলি প্রাতিষ্ঠানিক ভাবে করার জন্য হাজী সামর্তবান,তার সন্তানদের ও শুভাকাংখিদের নিয়ে পূর্বের পরিকল্পনা মাফিক স্বামী হাজী আব্দুল করিম মিয়া’র ইন্তেকালের দিন থেকেই অত্র ফাউন্ডেশনের কাজ গুলি পরিকল্পিত ভাবে করার জন্য পাঁচটি প্রকল্পের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে। তার মরহুম স্বামীর প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা ও সম্মান রক্ষার্থে নথিতে প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে তার স্বামীর নাম নথিভুক্ত করা হয়। তবে অলাভজনক উক্ত মানবীয় প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তার স্বামীর জীবনের অসমাপ্ত কাজ ও নিজের জীবনের অপূর্ণতা পূরনের জন্য সরাসরি সামনে থেকে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে পাঁচটি প্রকল্পের মাধ্যমেঃ
১। বিশুদ্ধ খাবার পানি বিতরন: এই প্রকল্পের আওতায় দৈনিক প্রায় ৫০০০ লিটার বিশুদ্ধ খাবার পানি ব্যবস্থা করা হয়।
২। সবার জন্য খাদ্য: এই প্রকল্পের আওতায় প্রাথমিকভাবে ইতোমধ্যে প্রায় ২০০০ জন রোজাদের জন্য মান সম্মত ইফতারের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
৩। গরীব ও মেধাবীদের জন্য শিক্ষা বৃত্তি: এই প্রকল্পের আওতায় সমগ্র ভাংগা উপজেলায় ৪০ জন এসএসসি ও দাখিল ২০২৪ এ উত্তীর্ণদের মাঝে জনপ্রতি ৩০০০/- টাকার প্রাইজবন্ড, সনদপত্র, ক্রেষ্ট বিতরন করা হয়, যা নীতিমালা অনুযায়ী অব্যাহত থাকবে।
৪। স্বাবলম্বী ও আত্বকর্মসংস্থান প্রকল্প: গ্রামভিত্তিক অতি দারিদ্র্যেতা দূরীকরনের জন্য ও প্রান্তিক পর্যায়ের অসহায় ও সুবিধাবঞ্চিত নারীদের স্বাবলম্বী করার জন্য ইতোমধ্যেই ৬৩ জন মহিলা কে সেলাইমেশিন বিতরণ করা হয়েছে এবং ৪ টি অটোভ্যান বিতরন করা হয়েছে যা গ্রামীন অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে। পরবতীতে তাদের কে সময়োপযোগী প্রশিক্ষণদানের জন্য সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে ইতিবাচক যোগাযোগ হয়েছে।তাদের উৎপাদিন পণ্যের যেনো উপযুক্ত বাজার মূল্য পায় তার জন্য কতিপয় পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে।
৫। অন্যান্য প্রকল্পঃ অত্র প্রকল্পের মাধ্যমে ইতোমধ্যে শীতার্তদের জন্য প্রায় ৩০০ পিছ কম্বল বিতরন করা হয়েছে, কুমিল্লা জেলায় বন্যার্তদের মাঝে সীমিত পরিসরে ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ করা হয়েছে, গ্রামের পথচারীদের জন্য ল্যাম্পপোষ্ট স্থাপন করা হয়েছে, বিভিন্ন মসজিদ ও মাদ্রাসার জন্য সোডিয়াম লাইট, কার্পেট,সহ অন্যান্য উপকরন বিতরণ করা হয়, প্রকৃত সুবিধাভোগীর মাঝে নগদ অর্থ ও পোষাক বিতরণ করা হয়, অন্যান্য কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়।
হাজী সামর্তবান অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ও প্রতিষ্ঠাতা সদস্যা হিসেবে সমাজের মানুষের মাঝে ভালো কাজের প্রতিযোগীতা অব্যাহত রাখার বিষয়ে দৃঢ়চেতা। ইতোমধ্যে একজন অবসরপ্রাপ্ত গুণী শিক্ষককে সংবর্ধনা দিয়েছে যা বিভিন্ন সেক্টরের অব্যাহত থাকবে। সমাজের সকল শ্রেণীর মানুষের ভালোবাসা ও সহযোগীতায় এত্তোদুর পথ পাড়ি দিতে পেরেছে। আমরা কৃতজ্ঞতা জানাই মাননীয় জেলা প্রশাসক মহোদয় ও তার সাথে সংশ্লিষ্ট সকলকে, ভাংগা উপজেলার সম্মানিত ইউএনও মহোদয় স্যার ও তার সাথে সংশ্লিষ্ট সকলকে, ঘারুয়া ইউনিয়নের সম্মানিত ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও তার সাথে সংশ্লিষ্ট সকলকে, প্রিয় সেচ্ছাসেবী ভাইয়েরা, প্রিয় সুবিধাভোগী ভাই-বোনেরা, প্রিয় সাংবাদিক ভাইয়েরা, প্রিয় এলাকাবাসী ও সকল শ্রেণীর জনগোষ্ঠী। পরিশেষে আল কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে কাজ যথাযথ ভাবে বাস্তবায়নের জন্য সবার সার্বিক সহযোগিতা একান্তভাবে কাম্য।
